মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

নদ-নদী

নদ-নদীঃনদ-নদী যেমন ভূগঠনের মুখ্য ভূমিকা পালন করছে তেমনি , মানব সভ্যতার ক্রম-বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে বিকশিত নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের অনেক নদী-তীরে গড়ে উঠেছে বন্দর, নগরী হাট বাজার ইত্যাদি।

আদিকাল থেকে গাইবান্ধা জেলার উপর দিয়ে ব্রক্ষপুত্র ম করতোয়া, তিস্তা, ঘাঘট, মানস, বাঙ্গালী ইত্যাদি নদ-নদী প্রবাহিত হয়েছে। জেলার ভূমিগঠন, জনবসতি স্থাপন, শস্য উৎপাদন , জলপথে যোগাযোগ , ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আর্থ -সামাজিক কর্মকান্ডে এবং নিজস্ব সংস্কৃতি বিকাশে এই নদ-নদী গুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।

১৮০৯ খৃীষ্টাব্দের জরিপে মি, বুকানন , হ্যামিলটন এতদাঞ্চারের নদী- নালা গুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ১৭৮৩ সালে জেমস রেনেল অংকিত বাংলাদেশের মানচিত্র যে, নদী -নালা গুলোর বিবরণ রয়েছে বর্তমানে সেগুলি চিহৃিত করা কষ্টসাধ্য। নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে এবং পরিত্যক্ত গতিপথ ভরাট হয়ে পুরানো নদীপথের চিহৃ মুছে গেছে। আবার একই নদীর গতিপ্রবাহ ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। তিনি ব্রক্ষপুত্র , তিস্তা, করতোয়া এর মূল ধারা শাখা -প্রশাখা ও উপনদী এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নালা গুলির বিষদ বিবরণ দিয়েছেন। গাইবান্ধার উপর দিয়ে যে নদীগুলো প্রবাহিত হয়েছে সেগুলোর মোট আয়তন ১০৭.৭১ কিঃ মিঃ নিম্নে এই নদী-নালা গুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলোঃ

 

ব্রক্ষ্মপুত্রঃ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘ নদ ব্রক্ষ্মপুত্র। তিববত সাংপো, আসামে ডিহং পরে ব্রক্ষ্মপুত্র। গাইবান্ধা জেলার তিস্তা নদীর মিলিত হওয়ার পরে কোনাই ব্রক্ষ্মপুত্র এবং ফুলছড়ি ঘাটের নিম্নে যমুনা নামধারণ করে একই নদী গোয়াললন্দের নিকট পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

তিববতের মানস সরোবরের নিকট চেমাইয়াংদূং হিমবাহ থেকে ব্রক্ষ্মপুত্র নদের উৎপত্তি। তিববতের অপর নাম সাংপো বা সানপো। এই নামে নদীটি হিমালয়ের পাদদেশে থেকে বরাবর উত্তর পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর সাদিয়া নামক স্থানে হিমালয়ের একটি ফাঁক দেখে নদী নেমে পরে ভারতের আসাম রাজ্যে। আসাম উপত্যকায় প্রথম ডিহং এবং পরে ব্রক্ষ্মপুত্র নামে নদীটি পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়। ৭২৪ কিঃ মিঃ প্রবাহিত হওয়ার পর গারো পাহাড়ের নিকট দক্ষিণ দিকে বাক নিয়ে নদীটি কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী থানার নারায়ণপুর ইউনিয়নের মায়ালী নামক স্থান দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এখান থেকে নদীটি দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে চিলমারী থানার দক্ষিণাংশ দিয়ে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়ণে প্রবেশ করে দক্ষিণে প্রবাহিত হতে থাকে এবং সাঘাটা থানার হলদিয়া ইউনিয়নের নলদিয়া গ্রামের মধ্যে দিয়ে এই নদী বগুড়া জেলায় প্রবেশ করেছে। গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাটেত্ম দক্ষিণে এই নদী কোনাই যমুনা বা যমুনা নাম ধারণ করে বগুড়া , সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, টাঙ্গাইল জেলার সীমানা অতিক্রম করে গোয়ালন্দের নিকট পদ্মা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। উৎসব থেকে শেষ পর্যন্ত এই নদী ২৭৩৭ কিঃ মিঃ তন্মধ্যে বাংলাদেশে এর অংশ ২৭৭ কিঃ মিঃ।

 

করতোয়াঃ করতোয়া একটি প্রাচীন নদী। প্রাচীন কালের এই বিশাল ও বেগবান নদীটি মংৎস্য দেশ (বরেন্দ্র ভূমি ও রাজা ভগদত্তের প্রাগজৈতিক (কামরুপ) রাজ্যের মধ্যবর্তী সীমা নিদের্শ করত। এই নদী তীরেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন জনপদ, নগর ,বন্দরগঞ্জ ইত্যাদি। প্রাচীন পৌন্ড্রবর্ন্ধন নগর, ঘোড়াঘাট সরকার বা প্রদেশের প্রধান শহর এবং দুর্গ , বোগদহ সভ্যতা, পঞ্চনগরী সহ উল্লেখযোগ্য স্থান সমূহ। বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং সপ্তম শতাব্দীতে কামরুপ ভ্রমণকালে পৌন্ড্রবর্ন্ধন (মহাস্থান) এর নিকট যে বিশাল কালুতু নদীর সম্মুখীন হয়েছিল , ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী তিববত অভিযানকালে বর্ন্ধনকোটের সন্নিকেটে যে, গংগার চেয়ে তিনগুন বিশাল বেগবতী নদীর সম্মুখে উপস্থিত হয়েছিলেন সেই কা-লু-তু ও বেগবতী নদীই প্রাচীন বিশাল করতোয়া নদী।

করতোয়া ভুটান সীমান্তের উত্তরে হিমালয় পর্বতরে পাদদেশ থেকে উৎসারিত হয়ে দার্জিলিং জলপাইকুড়ি জেলার মধ্যে দিয়ে পঞ্চগড় জেলার ভিতগড় নামক স্থান দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে দিনাজপুর জেলা হয়ে ঘোড়াঘাটের নিকট গাইবান্ধা জেলায় প্রবেশ করে গেবিন্দগঞ্জ থানা পশ্চিম দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বগুড়ার শিবগঞ্জের ভিতর দিয়ে পাবনা হয়ে যমুনায় পতিত হয়। কিন্তু ১৭৮৭ সালের প্রবল বন্যায় করতোয়া তার পুর্বতন গতিপথ পরিবর্তন করে গোবিন্দগঞ্জ থানায় ৪/৫ কিঃ মিঃ উত্তরে কাটাখালীতে মোড় নিয়ে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে রামপুর মৌজায় ত্রিমোহিনী ঘাটে গাইবান্ধা থেকে আগত আলাই এর সঙ্গে মিলিত হয়ে বাঙ্গালী নাম ধারণ করে বগুড়ার সোনাতলা থানায় প্রবেশ করার পর গিয়ে মেশে ফুলঝোড়া নদীতে। ফুলঝোড়া নদী পরর্বতীতে হুড়া সাগরে এবং শেষে উক্ত হুড়া সাগর যেয়ে মিলিত হয় যমুনায়। উল্লেখ্য, কাটাখালীতে করতোয়া যে, পথে পুর্ব দিকে অগ্রসর হয় তা বহুপুর্ব থেকে করতোয়ার একটি ক্ষুদ্র শাখা ছিল। ঐ করতোয়ার সাবেক ধারাটি উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শুকিয়ে এবং ভরাট হয়ে যায়, যা বর্তমানে উপজেলা পরিষদের পশ্চিম পার্শ্বে ক্ষুদ্র নালা হিসেবে পরিদৃষ্ট হয়।

১৮৫২ সারে করতোয়র সাবেক ধারাটি পুনুরুজ্জীবনের জন্য সরকার উদ্যোগ গ্রহন করে। করতোয়ার তল দেশ খনন করা হয় এবং বাঁধ নির্মাণ  করে এর প্রবাহ সাবেক পথে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়। এই খরচ নির্বাহের জন্য ১৮৫৬ সাল থেকে করতোয়ার উপর দিয়ে যাতায়াতকারী নৌকা, যানবাহনের উপর টোল আদায় করা হতো। করতোয়ার গতি পরিবর্তনের উদ্যোগ ব্যর্থ হলে ১৮৬৫ সালে টোল আদায়ের আদেশ রহিত করা হয়। বোধ হয় করতোয়া খনন এবং খাল কেটে এর সংস্কার ও গতি পরিবর্তনের চেষ্টার কারণেই গোবিন্দগঞ্জের উত্তরে করতোয় নদীর নাম লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে কাটাখালী হয়েছে।

নীহারঞ্জন রায় তার বাঙ্গালীর ইতিহাস আদি পর্ব গ্রন্থে বলেছেন উত্তর বঙ্গের সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রধান নদী করতোয়া। কিন্তু বর্তমানে এই নদীর অসংখ্য পরিত্যক্ত খাতের সন্ধান পাওয়া যায়। গাইবান্ধার উপর দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদী নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর এর দক্ষিণে একটি ক্ষুদ্র নালা আকারে দেখা যায়। এর দক্ষিণে প্রবাহ বদরগঞ্জ রেল ষ্টেশনের নিকট দেওনাই চারালকাটা নদীর সাথে মিলিত হয়ে দক্ষিণে করতোয়া নামে প্রবাহিত হয়ে গোবিন্দগঞ্জে প্রবেশ করেছে। এর পরবর্তী গতিপথ পূর্বে বর্ণানা করা হয়েছে।

 

তিস্তাঃহিমালয় সিকিমের পার্বত্য এলাকা, লাচেন এবং লাচুং নামের দুই পার্বত্য স্রোত ধারা থেকে তিস্তার উৎপত্তি। তিস্তা পার্বত্য অঞ্চরে রাংগু নামে পরিচিত । এর প্রবাহ পথে রাং নিচুক, ডিকচু, তালাংচু, চাকুংচু নামক বিভিন্ন স্রোতধারা  তিস্তার সাথে মিলিত হয়েছে। জলপাইগুড়ি  জেলায় সিবকের নিম্নে লিশ, সিশ , চেল ও নেংরা পার্বত্য স্রোতধারা তিস্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই নদী সিকিম দাজিংলিং, জলপাইগুড়ি ও কুচবিহারের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নীলফামারী জেলা ডিমলা থানার ছাতনাই গ্রামের নিকট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর অতিক্রম করে তিস্তা নদী গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা তারাপুর ইউনিয়নে প্রবেশ করে এবং উপজেলা উত্তর পূর্বাংশ দিয়ে কয়েক কিঃ মিঃ প্রবাহিত হয়ে হরিপুর ইউনিয়নের বাংলা বাজারের নিকট ব্রক্ষ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে।

প্রাচীনকালে তিস্তার স্রোতধারা তিনটিভাবে বিভক্ত হয়েছিল (১) পূর্ব শাখা করতোয়া (২) মধ্য শাখা আত্রাই এবং (৩) পশ্চিম শাখা পুর্নভবা নামে পরিচিত। মনে করা হয় এই তিনটি স্রোতধারা থেকেই ত্রিস্রোতা বা তিস্তা নামের উৎপত্তি হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন পানিতাত্ত্বিক ও টেকনিকের কারণে তিস্তা বিভিন্ন সময়ে এই তিনটি খাত অনুসরণ  করেছে। ১৭৮৭ পর্যন্ত তিস্তা নদী দিনাজপুরের নিকট আত্রাই এর সঙ্গে মিলিত হয়ে নিম্ন গঙ্গা নদীতে পতিত হতো।(ঋবৎসরহমবৎ ১৭৮৯)  এসময় মহানন্দ নদীও তিস্তা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে গঙ্গ (পদ্মা) নদীতে পতিত হতো। তিস্তার অপর শাখা করতোয়া ও গঙ্গায় ব্রক্ষ্মপুত্রের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতো। ধরলা, নিম্ন হিমালয় পাদদেশে তিস্তা নদী থেকে উৎপন্ন  হয়ে কুড়িগ্রামে ব্রক্ষ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। অপর গুরুত্বপূর্ন নদী ঘাঘট তিস্তা থেকে উৎপন্ন হয়ে রংপুর জেলার মধ্যে দিয়া প্রবাহিত হয়ে গাইবান্ধায় করতোয়ায় মিলিত হয়েছে। আত্রাই সেসময় করতোয়া ও গঙ্গার সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করত । (ঝধহুধষ ১৯৬৭)

১৭৮৩ সালে রেনেল অংকিত মানচিত্রে তিস্তার মূল প্রবাহ আত্রাই হতে প্রবাহিত হতে দেখা যায়।  এছাড়া ও তিস্তা ক্রিক নামে একটি অগুরুত্বপূর্ন শাখানদী তিস্তা ব্রক্ষ্মপুত্রের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করত। বিভিন্ন সময়ে ভূ- আন্দোলনে বরেন্দ্রভূমি কিছুটা উত্থিত হয় এবং তিস্তার পুরাতন গতিপথ সংর্কীণ হয়ে পড়ে। আত্রাই পূণভবা করতোয়া নদীতে বালি ও পলি জমে পানির ধারণ ক্ষমতা লোপ পায়। ১৭৮৭ সালে প্রবল বন্যার ফলে তিস্তার বিপুল জলরাশি পুরাতন খাতে প্রবাহিত না হয়ে কিছুকাল পর্যায়ক্রমে ঘাঘট ও মানস নদীপথে প্রবাহিত হতো। (মজুমদার ১৯৪২, রশিদ ১৯৯১) কিন্তু বন্যা জনিত বিপুল জলরাশির বহনের ক্ষমতা ঐ শাখা নদী দুইটির না থাকায় তিস্তা তার প্রবাহ বর্তমানকারে সংক্ষিপ্ত করে তিস্তা ক্রিক খাতটি দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ব্রক্ষ্মপুত্রে নদে পতিত হয়েছে। তিস্তা গাইবান্ধা জেলায় উত্তরে সামান্য অংশ দিয়ে প্রবাহিত হলে ও এর শাখা নদী করতোয়া, ঘাঘট, মানস, গজারিয়া এই জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং ভূমি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

 

গাইবান্ধা জেলার নদ-নদীঃ

ঘাঘটঃ প্রাচীনকালে থেকেই ঘাঘট একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। এর তীরেই গড়ে উঠেছে সাবেক জেলা সদর রংপুর এবং গাইবান্ধা জেলা সদর।

ঘাঘট তিস্তার শাখা নদী। নীলফামারীর জেলার কিশোরগঞ্জ থানার কুজিপাড়া গ্রামে এই নদীর উৎপত্তি। উৎপত্তিস্থল থেকে গঙ্গাচড়া থানার পশ্চিম সীমানা দিয়ে রংপুর সদর থানা অতিক্রম করে পীরগাছা থানায় প্রবেশ করে আলাইপুরি নদীকে সাথে নিয়ে সাদুল্যাপুর উপজেলার রসুলপুরের নিকট দিয়ে গাইবান্ধা জেলায় প্রবেশ করেছে। অতপর দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে সদর উপজেলার খোলাহাটী ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ঘাঘট গাইবান্ধা শহরে প্রবেশ করে শহরের পুর্বপার্শ্বে ডানদিকে মোড় নিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে।

১৯০৭ সালে ঘাঘট নদীকে গোদারহাট গ্রামের নিকট থেকে বাগুরিয়া পর্যন্ত তিন মাইল দীর্ঘ খাল খনন করে মরা মানসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই প্রবাহ রসুলপুর শ্লুইচ গেট অতিক্রম করে ব্রক্ষ্মপুত্র নদে পতিত হয়।

 

 

.............

 

 

 

১৯৫৪ সালেও ব্রহ্মপুত্রের বন্যায় গাইবান্ধা অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হয়। নিম্নাঞ্চলের সঙ্গে সঙ্গে সম্পুর্ণ গাইবান্ধা শহরও কয়েক ফূট পানির নীচে তলিয়ে গিয়েছিল।

১৯৬৪ ও ১৯৬৮ সালেও এই জেলায় ব্যাপক বন্যা হয়েছিল।

১৯৭৪ সালে কূড়িগ্রাম-গাইবান্ধাসহ প্রায় সম্পুর্ণ বংলাদেশে বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল। জানমালের ব্যাপক ক্ষতি, শস্যহানী, খাদ্য দ্রব্য অপ্রতুলতা দেশে দুর্ভিক্ষ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।

১৯৮৭-১৯৮৮ সালে গাহবান্ধাসহ সমগ্র বাংলাদেশই বন্যার কবলে পতিত হয়। এতে সমগ্র জোলার ব্যাপক ক্ষতি হয়। ব্রহ্মপুত্র প্রতিরক্ষা বাঁধের রসুলপুর সন্নিকটস্থ স্লুইচ গেটটিসহ বাঁধের অংশ বিশেষ প্রবল স্রেতে ভেঙ্গ যায়। এতে গাইবান্ধা পৌর এলাকাও বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছি। বাঁধ নির্মাণ করে এই জেলাকে ঘন ঘন বন্যার প্রকোপ থেকে রক্ষা করা হয়েছে।

১৯৯৫ সালে এ জেলার পশ্চিমাংশ গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় ব্যাপক বন্যা হয়। এই উপজেলার পশ্চিমাংশ অপেক্ষাকৃত উচু হওয়ায় এখানে কোন সময়ই বন্যার পানি উঠে না। কিন্তু হঠাৎ করেই করতোয়া নদীর পানিবৃদ্ধি হওয়ায় এর দু’তীরের এলাকা প্লাবিত হয়। মাটির তৈরী ঘরগুটি ধ্বসে যায়। বন্যার প্রবল তোড়ে বিশ্বরোডে ২টি ব্রীজ ভেঙ্গে গেলে সে সময় রংপুর, দিনাজপুরের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমানে ঘাঘট নদীর ভাংগন ও প্লাবন থেকে রক্ষার জন্য গাইবান্ধা শহরের উত্তর পাশ দিয়ে বিকল নদী খনন এবং প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

 

খরা:

এই অঞ্চলে বন্যার মত দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টি বা খরাও কয়েববর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। খাদ্য দ্রবের দুস্প্রাপ্যতা এবং কাজের অভাব তখন প্রকটভাবে দেখা দিয়েছিল, ফলে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়েছিলো

১৭৬৮-৬৯, ১৮৫৭-৫৮, ১৮৬২-৬৩, ১৮৬৬-৬৭, ১৮৭৪, ১৯০৮-০৯ এবং ইদানিংকালের ১৯৯২-৯৩ সালের খরা এবং এর প্রভাব অত্র জেলার উল্লেখযোগ্য । তবে এগুলির মাধ্যে ১৮৭৪ এবং ১৯০৮-০৯ সালের দীঘস্থায়ী খরা এবং এর জন্যে অপুরণীয় ক্ষতি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্যে। ১৮৫৭-৫৮, ১৮৬২-৬৩, ১৮৬৬-৬৭, ১৯৯২-৯৩ সালে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত না হওযায় এই খরার সৃষ্টি হয়েছিলা, সেচের অভাবে কৃষকেরা আমন ফসল চাষ করতে পারেনি। যারা কষ্ট করে খলে-বিলে থেকে পানি সেচ করে সামান্য জমিতে আমন চাষ করেছিল প্রচন্ড দবদাহে সেই শস্য ও পুড়ে গিয়েছিল। জেলার খাদ্যভাব হয়েছিল।   যেমন ১৮৬৬ সালে টাকায় ৯৩ সের চাল ক্রয় করা যেত কিন্তু খরার ফলে এবং ব্যবসায়ীদের বদৌলতে ঐ সময়  টাকায় মাত্র ৮ সের চাল ক্রয় করা যেত অর্থাৎ চালের সেরে ১২ ন্ডণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু পাশ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে খাদ্যদ্রব্য আমদানি এবং পরবর্তী রবি মৌসুমে অন্যান শস্য উৎপাদন হওয়ায় খরার জন্য সৃষ্ট এই খাদ্যাভব দুর্ভিক্ষের পর্যায়ে পৌছায়নি। অবশ্য ইদানিং কালের খরা যেমন ১৯৯২-৯৩ সালে খীয়ার অঞ্চলে প্রকটভাবে হলেও কৃষকেরা গভীর, অগভীর সেচ যন্ত্রের সাহায্যে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে দ্রব্যমুল্য খুব বেশী বৃদ্ধি পায়নি। ১৭৬৮ খৃষ্টাব্দে অনাবৃষ্টিতে সাবেক রংপুর জেলার ফসল উৎপাদন মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। দীর্ঘখরার বিভিন্ন শস্য ভান্ডারসহ সবকিছুই অগ্নিদগ্ধ ও ভস্মিভুত হয়। ১৭৬৯- ৭০ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক তৃতীয়াংশ লোক প্রাণ হারিয়েছিল। তবে এই দুর্ভিক্ষের তীব্রতা বাংলায় সর্বত্র সমান ছিল না। সিরাজুল ইসলামের বাংলার ইতিহাসে ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামো গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৃহত্তর রংপুর জেলার অন্তর্গত বর্তমানে গাইবান্ধা জেলাতেও এই দূর্ভিক্ষের প্রভাব ছিল অত্যন্ত বেশী। দুর্ভিক্ষের পুর্বে টাকায় ২ মন চাল পাওয়া গেলেও দুর্ভিক্ষের সময় টাকায় মাত্র ৩/৪ সের চল বিক্রি হয়েছে।

১৯০৭-১৯০৮ সালে পরপর দু’বার সংঘটিত খরা ছিল জেলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। তবে এই খরা কিছুটা আঞ্চলিক, খীয়ার অঞ্চলেই এর প্রভাব ছিল বেশি। সাবেক রংপুর জেলা মিঠাপুকুর পীরগঞ্জ এবং গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমাংশে এ খরায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মুলত: এই জেলার পূর্বাংশ দিয়ে বিভিন্ন নদ-নদী প্রবাহের কারণে বন্যা এলে উক্ত নিম্ন ভূমির আউশও আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পক্ষান্তরে পশ্চিমাংশের উচু লালমাটি এলাকা শুধুমাত্র এক ফসলী আমনের জমি স্বভাবতই খরা হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। বর্তমানে বোরো ফসল ব্যাপক ভাবে চাষাবাদ করার ফলে এবং সেচ ব্যবস্থা আধুনিক হওয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দুর্ভিক্ষের সম্ভবনা হ্রাস পেয়েছে।

 

 

 

 

ভূমিকম্প:

ব্রহ্মপুত্র উপতক্যায় অর্থাৎ আসাম অঞ্চলে ভূমিকম্পের হার অপেক্ষাকৃত বেশী। গাইবান্ধা জেলা ভুমিকম্প অঞ্চলের সন্নিকটস্থ হওয়ায় এই জেলাতে মাঝে মাঝে ভূমিকম্পন হয়। পূর্বের ভূমিকম্প গুলির কোন রেকর্ড না থাকলেও ১৮৮৫ সালের ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে সরকারি নথিতে। তবে ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে এবং এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য। ভূমিকম্পের ফলে ভূ-পৃষ্টের দ্রুত পরিবর্তন সাধিত হয়।

১৮৯৭ সালের ১২ ই জুন বিকেল ৫.১৫ মিনিটে স্থায়ী ভুমিকম্প বাংলা, বিহার ও আসামে ব্যাপক ক্ষতি করে। এর ফলে শষ্যাদি কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি, পাতকুয়া, রাস্তাঘাট, সড়কসেতু, রেলপথ বিধ্বস্ত হয় আবাদী জমি বালুচরে রুপান্তরিত হয়। এই ভূমিকম্পের ফলে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ছোট ছোট শাখা নদী খালের তলদেশ উত্থিত হওয়ায় এন্ডলির গতি হ্রাস পায়। এর ফলে ছোট ছোট শাখা নদী খালের তলদেশ উত্থিত হওয়ায় এগুলির গতি হ্রাস পায় বা অনেক ক্ষেত্রে গতি পথ পরিবর্তন হয়েছিল। সারাই ও মানস নদীসুন্দরগঞ্জ ও গাইবান্ধা উপজেলায়, আখিরা ও নলেয়া খাল পলাশবাড়ি উপজেলায় এবং জেলার ঘাঘট নদীর গতি প্রবাহ হ্রাস পায় এবং এই উজেলার পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক বিল উচু হয়ে আবাদী জমিতে পরিণত হয়,আবার অনেক উচু ও আগাছাপূর্ণ জমি বিল কুড়ায় (গভীর খাদ) পরিণত হয়েছে। উল্লেখিত সময়ে পীরগঞ্জের বড়বিলা থেকে সৃষ্ট নলেয়া খাল গতিপ্রাপ্ত হয়েছিল। এই ভুমিকম্পের প্রভাবে সাবেক রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহুকূমায়, অপেক্ষাকৃত বেশী পরিবর্তন হয়েছিল। ১৮৯৭ সালের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে এতদঅঞ্চলে একটি ছাড়া প্রচলিত রয়েছে।

 

তেরশ চার সালের

একত্রিশে জ্যৈষ্ঠ্য শনিবার

দুনিয়া মাঝে হইল মাঝার।

(সংগ্রহ: হাজী আফাজ উদ্দিন হক্কানী ব্রীজ রোড)

১৯২০ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ৬৮ বছরে এই অঞ্চলে ৪৬৪ বার ভূ-কম্পন হয়েছে, রিখটার ঙ্কেলে এসবের তীব্রতা ছিল ৫ থেকে ৮ । এসব মৃদু ভূমিকম্প উল্লেখযোগ্য নয় তাই এই ক্ষুদ্র পরিসরে এসব ভূ- কম্পেনের বিবরণ উপস্থাপন করা হলো না।

 

 

গাইবান্ধা জেলায় জলপথ ও স্থলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

গাইবান্ধা জেলার নদী গুলির তীরেই গড়ে উঠেছিল আদিকালের জনবসতি, ব্যবসা কেন্দ্র, প্রশাসনিক কেন্দ্র, ভবানীগঞ্জ, কালগিঞ্জ, সুন্দরগঞ্জ, গোবিন্দগোঞ্জ, ঘোড়াঘাট, তুলশসীঘাট, গাইবান্ধা, বাদিয়াখালী, মহিমাগঞ্জ, সাহেবগঞ্জ ইত্যাদি। যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ছিল ছোট-বড় নৌকা, বজরা।

 

রংপুর এবং গাইবান্ধা উভয় শহরই ঘাঘট নদীর তীরে অবস্থিত। নৌকা ছিল যোগাযোগের মাধ্যম। ১৯০৭-০৮ সালে ঘাঘট বাগুড়িয়া খালের সংযোগ নিয়ে মানস হয়ে বহ্মপুত্র নদের সঙ্গে যুক্ত হলে ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। নদী পথেই গাইবান্ধার পাট নারায়ণগঞ্জ-ঢাকায় রপ্তানী হয়। মহাজনী মাল ঢাকা থেকে এবং নারিকেল নিয়ে বড় বড় নৌকা খুলনা-বরিশাল থেকে গাইবান্ধায় আসে। তিস্তা নদী রংপুর-হারাগাছ সুন্দরগঞ্জ হয়ে ঢাকা খুলনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করত। করতোয়া নদী আদিকালে পুন্ড্রবর্ধন (মহাস্থান) থেকে গোবিন্দগঞ্জ হয়ে ঘোড়াঘাট এর সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করত। ঘোড়াঘাট থেকে পাঠান শাসকরাও করতোয়া দিয়ে ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করত। জেলার অভ্যন্তরে ছোট ছোট নালা খাল দিয়ে বিভিন্ন বন্দর হাট, লোকালয়ে যাতায়াত করা যেত। রেল চালু হওয়ার আগে কলিকাতা ও আসামের সংযোগ গড়ে তুলেছিল। ‘‘রিভারস্কীম নেভিগেশন কোম্পানী ও ইন্ডিয়া জেনারেল স্কীম নেভিগেশন কোম্পানী’’ এর জাহাজ কলিকাতা থেকে আসাম যাতায়াত করত। ব্রহ্মপুত্র নদী তীর কালীগঞ্জে (ভবানীগঞ্জ থানা রংপুর জেলা) স্টীমার স্টেশন ছিল। তৎকালে জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা এই ঘাট কেন্দ্রীক গড়ে উঠেছিল।


Share with :

Facebook Twitter