মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভৌগলিক পরিচিতি

গাইবান্ধা জেলার ভৌগলিক বিবরন

পটভূমিঃইতিহাসে মানব জাতির সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়। আর ইতিহাস রচনায় ভিত হিসেবে মানুষের ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের তথা ভূগোলের গুরুত্ব অপরিসীম। অধ্যাপক ডাডলি ষ্ট্যাম্পের মতানুসারে, ‘‘মানুষের আবাসস্থল হিসাবে পৃথিবী সম্বন্ধে পাঠ, মানুষ ও তার কর্মকান্ডের প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব আলোচনায় হল ভূগোল ’’। প্রকৃতির কোলে লালিত মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বিবর্তন, পরিবর্তন, পরিবর্ধন, ভৌগলিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল। তাই কোন দেশের বা অঞ্চলের আঞ্চলিক ইতিহাস-ঐতিহ্য রচনায় সর্বাগ্রে প্রয়োজন সেই অঞ্চলের ভৌগলিক অবস্থান, ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, নদ-নদী, সমুদ্র, প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি উৎপাদন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে সম্যক আলোচনা। গাইবান্ধা জেলার ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও অত্র জেলার ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য সমূহের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল।

অবস্থানঃ উত্তর বঙ্গের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী জনপদ গাইবান্ধা জেলা ব্রক্ষপুত্র নদের ডান তীরে ২৫৩র্ থেকে ২৫৩৯র্ উত্তর অক্ষাংশে এবং ৮৯১২র্ থেকে ৮৯৪২র্ পূর্ব দ্রঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।

সীমানাঃ গাইবান্ধা জেলার উত্তরে তিস্তা নদী এবং কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলা, উত্তর পশ্চিমে রংপুর জেলার পীরগাছা এবং পশ্চিম পার্শ্বে রংপুর জেলার মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জ উপজেলা এবং দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলা, পশ্চিম-দক্ষিণে জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলা এবং দক্ষিণে বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ ও সোনাতলা উপজেলা এবং পূর্ব পার্শ্বে বহমান ব্রক্ষপুত্র নদ।

আয়তনঃ  গাইবান্ধা জেলার ৭টি উপজেলা যথাক্রমে (১) সদর (২) সুন্দরগঞ্জ (৩) সাদুল্ল্যাপুর (৪) পলাশবাড়ী (৫) গোবিন্দগঞ্জ (৬) ফুলছড়ি (৭) সাঘাটা উপজেলা। ৮২টি ইউনিয়ন, ১১০১টি মৌজা এবং ২টি পৌরসভা (সদর ও গোবিন্দগঞ্জ) নিয়ে গঠিত। জেলার মোট আয়তন ২১৭৯.২৭ বর্গকিলোমিটার (১০৭.৭ বর্গকিলোমিটার নদীয় আয়তন সহকারে) এবং জনসংখ্যা ১৯৯১ সালের আদমশুমারী রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯,৪৯,২৭৪ জন।

ভূ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যঃ  গাইবান্ধা জেলা বৃহত্তর বঙ্গ প্লাবন ভুমিতে অবস্থিত হলেও এর উপর দিয়ে প্রবাহিত নদী সমূহের গতিপথ পরিবর্তন এবং ভূ-কম্পনজনিত ভূ-উত্তোলনের ফলে এই জেলার ভূমি গঠনের বৈশিষ্ট্য অপরাপর জেলা গুলির চাইতে কিছুটা ভিন্নতর। গাইবান্ধা জেলার অধিকাংশ ভুমি নদী পলল দ্বারা গঠিত।

ভূ-প্রকৃতিঃ কোন দেশের কৃষি, শিক্ষা, ব্যবসা-বানিজ্য, পরিবহন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জনবসতির উপর সেই দেশের ভূ-প্রকৃতি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। ভূ-প্রকৃতির ভিত্তিতে বাংলাদেশের তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।

(ক) টারশিয়ারী যুগের পাহাড় সমূহ:টারশিয়ারী যুগে (আনুমানিক ৭৫ মিলিয়ন বছর আগে) হিমালয় পর্বত  উত্থিত হওয়ার সমসাময়িক কালে এসব টিলা ও পাহাড়ের সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে এই পাহাড় শ্রেণীর কোনরূপ বৈশিষ্ট্য গাইবান্ধা জেলায় লক্ষ্য করা যায় না।

(খ) প্লায়স্টোসিম যুগের সোপান সমূহ:প্রায় ১৩ লক্ষ বছর পূর্বে সূচনা হয়ে ২৫০০০(পuঁচশ হাজার) বছর পর্যন্ত কালকে প্লায়স্টোসিম যুগ বলা হয়। গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ পূর্বাংশের কয়েকটি ইউনিয়েন এই রকম বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় যা স্থানীয়ভাবে ‘খিয়ার’ এলাকা নামে পরিচিত।

(গ) নবীন ভূ-তাত্ত্বিক যুগের প্লাবন সমূহঃ টারসিয়ারী যুগের পাহাড় সমূহ এবং প্লায়স্টোসিম যুগের সোপান সমুহ ব্যাতিত সমস্ত বাংলাদেশের অধিকাংশ  এলাকা উৎপত্তি হয়েছে নবীন ভূ-তাত্ত্বিক যুগে (আনুমানিক ২৫০০০বছরের কম সময়ে) যা গাইবান্ধা জেলার অধিকাংশ ভূমি গঠনের ক্ষেত্রে বিদ্যামান। ক্ষুদ্র আয়তনের গাইবান্ধা জেলার টারসিয়ারী যুগের পাহাড় নাই। জেলার দক্ষিন পশ্চিমে প্লায়াস্টোসিম যুগে সৃষ্ট বরেন্দ্রভূমির কিয়দাংশ রয়েছে। জেলার অবশিষ্ট ৯০ ভাগ অংশ নবীন ভূ-তাত্ত্বিক যুগের প্লাবন সমভূমির অর্ন্তগত যা ব্রক্ষপুত্র, করতোয়া তিস্তা বিধৌত। কাজেই ভূ-প্রকৃতি ও মৃত্তিকার গঠন অনুযায়ী জেলাটিকে দু’ভাগে ভাগ করা যায় (ঋঅঙ-১৯৯১) যথাঃ (ক) প্লাবন সমভূমি (খ) বরেন্দ্র সমভূমি।

মাটির শ্রেণীঃ কোন স্থানের মাটির গুনাগুণের উপর সেখানকার অনেক কিছু নির্ভর করে। মাটির বুনটের ভিত্তিতে গাইবান্ধার মাটিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথাঃ ক) বেলে মাটি খ) দোঁয়াশ মাটি গ) এটেল মাটি।

ক) বেলে মাটিঃ ব্রক্ষপুত্র, তিস্তা, করতোয়া বিধৌত গাইবান্ধা জেলার নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলে বেলে মাটি দেখা যায়। বেলে মাটিতে চিনাবাদাম, চিনা, কাউন, সরিষা, আখ, তরমুজ ইত্যাদি জন্মে।

খ) দোঁয়াশ মাটিঃ গাইবান্ধা জেলার নদী তীরবর্তী বেলে মাটি এবং পশ্চিমে বরেন্দ্র ব্যাতিত সম্পূর্ণ ভূমিই দোঁয়াশ মাটি।

গ) এটেল মাটিঃ জেলার গোবিন্দঞ্জ থানার খিয়ার অঞ্চলে এটেল, দোঁয়াশ মাটি ও পাওয়া যায়। এই মাটিতে ধান, গম, ভূট্টা ইত্যাদি ফলন হলেও পাট ও সব্জী তেমন উৎপাদিত হয় না।

নদ-নদীঃনদ-নদী যেমন ভূগঠনের মুখ্য ভূমিকা পালন করছে তেমনি , মানব সভ্যতার ক্রম-বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে বিকশিত নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের অনেক নদী-তীরে গড়ে উঠেছে বন্দর, নগরী হাট বাজার ইত্যাদি।

আদিকাল থেকে গাইবান্ধা জেলার উপর দিয়ে ব্রক্ষপুত্র ম করতোয়া, তিস্তা, ঘাঘট, মানস, বাঙ্গালী ইত্যাদি নদ-নদী প্রবাহিত হয়েছে। জেলার ভূমিগঠন, জনবসতি স্থাপন, শস্য উৎপাদন , জলপথে যোগাযোগ , ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আর্থ -সামাজিক কর্মকান্ডে এবং নিজস্ব সংস্কৃতি বিকাশে এই নদ-নদী গুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।

১৮০৯ খৃীষ্টাব্দের জরিপে মি, বুকানন , হ্যামিলটন এতদাঞ্চারের নদী- নালা গুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ১৭৮৩ সালে জেমস রেনেল অংকিত বাংলাদেশের মানচিত্র যে, নদী -নালা গুলোর বিবরণ রয়েছে বর্তমানে সেগুলি চিহৃিত করা কষ্টসাধ্য। নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে এবং পরিত্যক্ত গতিপথ ভরাট হয়ে পুরানো নদীপথের চিহৃ মুছে গেছে। আবার একই নদীর গতিপ্রবাহ ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। তিনি ব্রক্ষপুত্র , তিস্তা, করতোয়া এর মূল ধারা শাখা -প্রশাখা ও উপনদী এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নালা গুলির বিষদ বিবরণ দিয়েছেন। গাইবান্ধার উপর দিয়ে যে নদীগুলো প্রবাহিত হয়েছে সেগুলোর মোট আয়তন ১০৭.৭১ কিঃ মিঃ নিম্নে এই নদী-নালা গুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলোঃ

 

ব্রক্ষ্মপুত্রঃ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘ নদ ব্রক্ষ্মপুত্র। তিববত সাংপো, আসামে ডিহং পরে ব্রক্ষ্মপুত্র। গাইবান্ধা জেলার তিস্তা নদীর মিলিত হওয়ার পরে কোনাই ব্রক্ষ্মপুত্র এবং ফুলছড়ি ঘাটের নিম্নে যমুনা নামধারণ করে একই নদী গোয়াললন্দের নিকট পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

তিববতের মানস সরোবরের নিকট চেমাইয়াংদূং হিমবাহ থেকে ব্রক্ষ্মপুত্র নদের উৎপত্তি। তিববতের অপর নাম সাংপো বা সানপো। এই নামে নদীটি হিমালয়ের পাদদেশে থেকে বরাবর উত্তর পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর সাদিয়া নামক স্থানে হিমালয়ের একটি ফাঁক দেখে নদী নেমে পরে ভারতের আসাম রাজ্যে। আসাম উপত্যকায় প্রথম ডিহং এবং পরে ব্রক্ষ্মপুত্র নামে নদীটি পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়। ৭২৪ কিঃ মিঃ প্রবাহিত হওয়ার পর গারো পাহাড়ের নিকট দক্ষিণ দিকে বাক নিয়ে নদীটি কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী থানার নারায়ণপুর ইউনিয়নের মায়ালী নামক স্থান দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এখান থেকে নদীটি দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে চিলমারী থানার দক্ষিণাংশ দিয়ে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়ণে প্রবেশ করে দক্ষিণে প্রবাহিত হতে থাকে এবং সাঘাটা থানার হলদিয়া ইউনিয়নের নলদিয়া গ্রামের মধ্যে দিয়ে এই নদী বগুড়া জেলায় প্রবেশ করেছে। গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাটেত্ম দক্ষিণে এই নদী কোনাই যমুনা বা যমুনা নাম ধারণ করে বগুড়া , সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, টাঙ্গাইল জেলার সীমানা অতিক্রম করে গোয়ালন্দের নিকট পদ্মা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। উৎসব থেকে শেষ পর্যন্ত এই নদী ২৭৩৭ কিঃ মিঃ তন্মধ্যে বাংলাদেশে এর অংশ ২৭৭ কিঃ মিঃ।

 

করতোয়াঃ করতোয়া একটি প্রাচীন নদী। প্রাচীন কালের এই বিশাল ও বেগবান নদীটি মংৎস্য দেশ (বরেন্দ্র ভূমি ও রাজা ভগদত্তের প্রাগজৈতিক (কামরুপ) রাজ্যের মধ্যবর্তী সীমা নিদের্শ করত। এই নদী তীরেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন জনপদ, নগর ,বন্দরগঞ্জ ইত্যাদি। প্রাচীন পৌন্ড্রবর্ন্ধন নগর, ঘোড়াঘাট সরকার বা প্রদেশের প্রধান শহর এবং দুর্গ , বোগদহ সভ্যতা, পঞ্চনগরী সহ উল্লেখযোগ্য স্থান সমূহ। বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং সপ্তম শতাব্দীতে কামরুপ ভ্রমণকালে পৌন্ড্রবর্ন্ধন (মহাস্থান) এর নিকট যে বিশাল কালুতু নদীর সম্মুখীন হয়েছিল , ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী তিববত অভিযানকালে বর্ন্ধনকোটের সন্নিকেটে যে, গংগার চেয়ে তিনগুন বিশাল বেগবতী নদীর সম্মুখে উপস্থিত হয়েছিলেন সেই কা-লু-তু ও বেগবতী নদীই প্রাচীন বিশাল করতোয়া নদী।

করতোয়া ভুটান সীমান্তের উত্তরে হিমালয় পর্বতরে পাদদেশ থেকে উৎসারিত হয়ে দার্জিলিং জলপাইকুড়ি জেলার মধ্যে দিয়ে পঞ্চগড় জেলার ভিতগড় নামক স্থান দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে দিনাজপুর জেলা হয়ে ঘোড়াঘাটের নিকট গাইবান্ধা জেলায় প্রবেশ করে গেবিন্দগঞ্জ থানা পশ্চিম দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বগুড়ার শিবগঞ্জের ভিতর দিয়ে পাবনা হয়ে যমুনায় পতিত হয়। কিন্তু ১৭৮৭ সালের প্রবল বন্যায় করতোয়া তার পুর্বতন গতিপথ পরিবর্তন করে গোবিন্দগঞ্জ থানায় ৪/৫ কিঃ মিঃ উত্তরে কাটাখালীতে মোড় নিয়ে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে রামপুর মৌজায় ত্রিমোহিনী ঘাটে গাইবান্ধা থেকে আগত আলাই এর সঙ্গে মিলিত হয়ে বাঙ্গালী নাম ধারণ করে বগুড়ার সোনাতলা থানায় প্রবেশ করার পর গিয়ে মেশে ফুলঝোড়া নদীতে। ফুলঝোড়া নদী পরর্বতীতে হুড়া সাগরে এবং শেষে উক্ত হুড়া সাগর যেয়ে মিলিত হয় যমুনায়। উল্লেখ্য, কাটাখালীতে করতোয়া যে, পথে পুর্ব দিকে অগ্রসর হয় তা বহুপুর্ব থেকে করতোয়ার একটি ক্ষুদ্র শাখা ছিল। ঐ করতোয়ার সাবেক ধারাটি উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শুকিয়ে এবং ভরাট হয়ে যায়, যা বর্তমানে উপজেলা পরিষদের পশ্চিম পার্শ্বে ক্ষুদ্র নালা হিসেবে পরিদৃষ্ট হয়।

১৮৫২ সারে করতোয়র সাবেক ধারাটি পুনুরুজ্জীবনের জন্য সরকার উদ্যোগ গ্রহন করে। করতোয়ার তল দেশ খনন করা হয় এবং বাঁধ নির্মাণ  করে এর প্রবাহ সাবেক পথে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়। এই খরচ নির্বাহের জন্য ১৮৫৬ সাল থেকে করতোয়ার উপর দিয়ে যাতায়াতকারী নৌকা, যানবাহনের উপর টোল আদায় করা হতো। করতোয়ার গতি পরিবর্তনের উদ্যোগ ব্যর্থ হলে ১৮৬৫ সালে টোল আদায়ের আদেশ রহিত করা হয়। বোধ হয় করতোয়া খনন এবং খাল কেটে এর সংস্কার ও গতি পরিবর্তনের চেষ্টার কারণেই গোবিন্দগঞ্জের উত্তরে করতোয় নদীর নাম লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে কাটাখালী হয়েছে।

নীহারঞ্জন রায় তার বাঙ্গালীর ইতিহাস আদি পর্ব গ্রন্থে বলেছেন উত্তর বঙ্গের সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রধান নদী করতোয়া। কিন্তু বর্তমানে এই নদীর অসংখ্য পরিত্যক্ত খাতের সন্ধান পাওয়া যায়। গাইবান্ধার উপর দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদী নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর এর দক্ষিণে একটি ক্ষুদ্র নালা আকারে দেখা যায়। এর দক্ষিণে প্রবাহ বদরগঞ্জ রেল ষ্টেশনের নিকট দেওনাই চারালকাটা নদীর সাথে মিলিত হয়ে দক্ষিণে করতোয়া নামে প্রবাহিত হয়ে গোবিন্দগঞ্জে প্রবেশ করেছে। এর পরবর্তী গতিপথ পূর্বে বর্ণানা করা হয়েছে।

 

তিস্তাঃহিমালয় সিকিমের পার্বত্য এলাকা, লাচেন এবং লাচুং নামের দুই পার্বত্য স্রোত ধারা থেকে তিস্তার উৎপত্তি। তিস্তা পার্বত্য অঞ্চরে রাংগু নামে পরিচিত । এর প্রবাহ পথে রাং নিচুক, ডিকচু, তালাংচু, চাকুংচু নামক বিভিন্ন স্রোতধারা  তিস্তার সাথে মিলিত হয়েছে। জলপাইগুড়ি  জেলায় সিবকের নিম্নে লিশ, সিশ , চেল ও নেংরা পার্বত্য স্রোতধারা তিস্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই নদী সিকিম দাজিংলিং, জলপাইগুড়ি ও কুচবিহারের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নীলফামারী জেলা ডিমলা থানার ছাতনাই গ্রামের নিকট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর অতিক্রম করে তিস্তা নদী গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা তারাপুর ইউনিয়নে প্রবেশ করে এবং উপজেলা উত্তর পূর্বাংশ দিয়ে কয়েক কিঃ মিঃ প্রবাহিত হয়ে হরিপুর ইউনিয়নের বাংলা বাজারের নিকট ব্রক্ষ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে।

প্রাচীনকালে তিস্তার স্রোতধারা তিনটিভাবে বিভক্ত হয়েছিল (১) পূর্ব শাখা করতোয়া (২) মধ্য শাখা আত্রাই এবং (৩) পশ্চিম শাখা পুর্নভবা নামে পরিচিত। মনে করা হয় এই তিনটি স্রোতধারা থেকেই ত্রিস্রোতা বা তিস্তা নামের উৎপত্তি হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন পানিতাত্ত্বিক ও টেকনিকের কারণে তিস্তা বিভিন্ন সময়ে এই তিনটি খাত অনুসরণ  করেছে। ১৭৮৭ পর্যন্ত তিস্তা নদী দিনাজপুরের নিকট আত্রাই এর সঙ্গে মিলিত হয়ে নিম্ন গঙ্গা নদীতে পতিত হতো।(ঋবৎসরহমবৎ ১৭৮৯)  এসময় মহানন্দ নদীও তিস্তা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে গঙ্গ (পদ্মা) নদীতে পতিত হতো। তিস্তার অপর শাখা করতোয়া ও গঙ্গায় ব্রক্ষ্মপুত্রের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতো। ধরলা, নিম্ন হিমালয় পাদদেশে তিস্তা নদী থেকে উৎপন্ন  হয়ে কুড়িগ্রামে ব্রক্ষ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। অপর গুরুত্বপূর্ন নদী ঘাঘট তিস্তা থেকে উৎপন্ন হয়ে রংপুর জেলার মধ্যে দিয়া প্রবাহিত হয়ে গাইবান্ধায় করতোয়ায় মিলিত হয়েছে। আত্রাই সেসময় করতোয়া ও গঙ্গার সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করত । (ঝধহুধষ ১৯৬৭)

১৭৮৩ সালে রেনেল অংকিত মানচিত্রে তিস্তার মূল প্রবাহ আত্রাই হতে প্রবাহিত হতে দেখা যায়।  এছাড়া ও তিস্তা ক্রিক নামে একটি অগুরুত্বপূর্ন শাখানদী তিস্তা ব্রক্ষ্মপুত্রের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করত। বিভিন্ন সময়ে ভূ- আন্দোলনে বরেন্দ্রভূমি কিছুটা উত্থিত হয় এবং তিস্তার পুরাতন গতিপথ সংর্কীণ হয়ে পড়ে। আত্রাই পূণভবা করতোয়া নদীতে বালি ও পলি জমে পানির ধারণ ক্ষমতা লোপ পায়। ১৭৮৭ সালে প্রবল বন্যার ফলে তিস্তার বিপুল জলরাশি পুরাতন খাতে প্রবাহিত না হয়ে কিছুকাল পর্যায়ক্রমে ঘাঘট ও মানস নদীপথে প্রবাহিত হতো। (মজুমদার ১৯৪২, রশিদ ১৯৯১) কিন্তু বন্যা জনিত বিপুল জলরাশির বহনের ক্ষমতা ঐ শাখা নদী দুইটির না থাকায় তিস্তা তার প্রবাহ বর্তমানকারে সংক্ষিপ্ত করে তিস্তা ক্রিক খাতটি দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ব্রক্ষ্মপুত্রে নদে পতিত হয়েছে। তিস্তা গাইবান্ধা জেলায় উত্তরে সামান্য অংশ দিয়ে প্রবাহিত হলে ও এর শাখা নদী করতোয়া, ঘাঘট, মানস, গজারিয়া এই জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং ভূমি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

 

গাইবান্ধা জেলার নদ-নদীঃ

ঘাঘটঃ প্রাচীনকালে থেকেই ঘাঘট একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। এর তীরেই গড়ে উঠেছে সাবেক জেলা সদর রংপুর এবং গাইবান্ধা জেলা সদর।

ঘাঘট তিস্তার শাখা নদী। নীলফামারীর জেলার কিশোরগঞ্জ থানার কুজিপাড়া গ্রামে এই নদীর উৎপত্তি। উৎপত্তিস্থল থেকে গঙ্গাচড়া থানার পশ্চিম সীমানা দিয়ে রংপুর সদর থানা অতিক্রম করে পীরগাছা থানায় প্রবেশ করে আলাইপুরি নদীকে সাথে নিয়ে সাদুল্যাপুর উপজেলার রসুলপুরের নিকট দিয়ে গাইবান্ধা জেলায় প্রবেশ করেছে। অতপর দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে সদর উপজেলার খোলাহাটী ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ঘাঘট গাইবান্ধা শহরে প্রবেশ করে শহরের পুর্বপার্শ্বে ডানদিকে মোড় নিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে।

১৯০৭ সালে ঘাঘট নদীকে গোদারহাট গ্রামের নিকট থেকে বাগুরিয়া পর্যন্ত তিন মাইল দীর্ঘ খাল খনন করে মরা মানসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই প্রবাহ রসুলপুর শ্লুইচ গেট অতিক্রম করে ব্রক্ষ্মপুত্র নদে পতিত হয়।

.............

১৯৫৪ সালেও ব্রহ্মপুত্রের বন্যায় গাইবান্ধা অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হয়। নিম্নাঞ্চলের সঙ্গে সঙ্গে সম্পুর্ণ গাইবান্ধা শহরও কয়েক ফূট পানির নীচে তলিয়ে গিয়েছিল।

১৯৬৪ ও ১৯৬৮ সালেও এই জেলায় ব্যাপক বন্যা হয়েছিল।

১৯৭৪ সালে কূড়িগ্রাম-গাইবান্ধাসহ প্রায় সম্পুর্ণ বংলাদেশে বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল। জানমালের ব্যাপক ক্ষতি, শস্যহানী, খাদ্য দ্রব্য অপ্রতুলতা দেশে দুর্ভিক্ষ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।

১৯৮৭-১৯৮৮ সালে গাহবান্ধাসহ সমগ্র বাংলাদেশই বন্যার কবলে পতিত হয়। এতে সমগ্র জোলার ব্যাপক ক্ষতি হয়। ব্রহ্মপুত্র প্রতিরক্ষা বাঁধের রসুলপুর সন্নিকটস্থ স্লুইচ গেটটিসহ বাঁধের অংশ বিশেষ প্রবল স্রেতে ভেঙ্গ যায়। এতে গাইবান্ধা পৌর এলাকাও বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছি। বাঁধ নির্মাণ করে এই জেলাকে ঘন ঘন বন্যার প্রকোপ থেকে রক্ষা করা হয়েছে।

১৯৯৫ সালে এ জেলার পশ্চিমাংশ গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় ব্যাপক বন্যা হয়। এই উপজেলার পশ্চিমাংশ অপেক্ষাকৃত উচু হওয়ায় এখানে কোন সময়ই বন্যার পানি উঠে না। কিন্তু হঠাৎ করেই করতোয়া নদীর পানিবৃদ্ধি হওয়ায় এর দু’তীরের এলাকা প্লাবিত হয়। মাটির তৈরী ঘরগুটি ধ্বসে যায়। বন্যার প্রবল তোড়ে বিশ্বরোডে ২টি ব্রীজ ভেঙ্গে গেলে সে সময় রংপুর, দিনাজপুরের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমানে ঘাঘট নদীর ভাংগন ও প্লাবন থেকে রক্ষার জন্য গাইবান্ধা শহরের উত্তর পাশ দিয়ে বিকল নদী খনন এবং প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

 

খরা:

এই অঞ্চলে বন্যার মত দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টি বা খরাও কয়েববর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। খাদ্য দ্রবের দুস্প্রাপ্যতা এবং কাজের অভাব তখন প্রকটভাবে দেখা দিয়েছিল, ফলে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়েছিলো

১৭৬৮-৬৯, ১৮৫৭-৫৮, ১৮৬২-৬৩, ১৮৬৬-৬৭, ১৮৭৪, ১৯০৮-০৯ এবং ইদানিংকালের ১৯৯২-৯৩ সালের খরা এবং এর প্রভাব অত্র জেলার উল্লেখযোগ্য । তবে এগুলির মাধ্যে ১৮৭৪ এবং ১৯০৮-০৯ সালের দীঘস্থায়ী খরা এবং এর জন্যে অপুরণীয় ক্ষতি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্যে। ১৮৫৭-৫৮, ১৮৬২-৬৩, ১৮৬৬-৬৭, ১৯৯২-৯৩ সালে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত না হওযায় এই খরার সৃষ্টি হয়েছিলা, সেচের অভাবে কৃষকেরা আমন ফসল চাষ করতে পারেনি। যারা কষ্ট করে খলে-বিলে থেকে পানি সেচ করে সামান্য জমিতে আমন চাষ করেছিল প্রচন্ড দবদাহে সেই শস্য ও পুড়ে গিয়েছিল। জেলার খাদ্যভাব হয়েছিল।   যেমন ১৮৬৬ সালে টাকায় ৯৩ সের চাল ক্রয় করা যেত কিন্তু খরার ফলে এবং ব্যবসায়ীদের বদৌলতে ঐ সময়  টাকায় মাত্র ৮ সের চাল ক্রয় করা যেত অর্থাৎ চালের সেরে ১২ ন্ডণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু পাশ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে খাদ্যদ্রব্য আমদানি এবং পরবর্তী রবি মৌসুমে অন্যান শস্য উৎপাদন হওয়ায় খরার জন্য সৃষ্ট এই খাদ্যাভব দুর্ভিক্ষের পর্যায়ে পৌছায়নি। অবশ্য ইদানিং কালের খরা যেমন ১৯৯২-৯৩ সালে খীয়ার অঞ্চলে প্রকটভাবে হলেও কৃষকেরা গভীর, অগভীর সেচ যন্ত্রের সাহায্যে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে দ্রব্যমুল্য খুব বেশী বৃদ্ধি পায়নি। ১৭৬৮ খৃষ্টাব্দে অনাবৃষ্টিতে সাবেক রংপুর জেলার ফসল উৎপাদন মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। দীর্ঘখরার বিভিন্ন শস্য ভান্ডারসহ সবকিছুই অগ্নিদগ্ধ ও ভস্মিভুত হয়। ১৭৬৯- ৭০ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক তৃতীয়াংশ লোক প্রাণ হারিয়েছিল। তবে এই দুর্ভিক্ষের তীব্রতা বাংলায় সর্বত্র সমান ছিল না। সিরাজুল ইসলামের বাংলার ইতিহাসে ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামো গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৃহত্তর রংপুর জেলার অন্তর্গত বর্তমানে গাইবান্ধা জেলাতেও এই দূর্ভিক্ষের প্রভাব ছিল অত্যন্ত বেশী। দুর্ভিক্ষের পুর্বে টাকায় ২ মন চাল পাওয়া গেলেও দুর্ভিক্ষের সময় টাকায় মাত্র ৩/৪ সের চল বিক্রি হয়েছে।

১৯০৭-১৯০৮ সালে পরপর দু’বার সংঘটিত খরা ছিল জেলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। তবে এই খরা কিছুটা আঞ্চলিক, খীয়ার অঞ্চলেই এর প্রভাব ছিল বেশি। সাবেক রংপুর জেলা মিঠাপুকুর পীরগঞ্জ এবং গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমাংশে এ খরায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মুলত: এই জেলার পূর্বাংশ দিয়ে বিভিন্ন নদ-নদী প্রবাহের কারণে বন্যা এলে উক্ত নিম্ন ভূমির আউশও আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পক্ষান্তরে পশ্চিমাংশের উচু লালমাটি এলাকা শুধুমাত্র এক ফসলী আমনের জমি স্বভাবতই খরা হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। বর্তমানে বোরো ফসল ব্যাপক ভাবে চাষাবাদ করার ফলে এবং সেচ ব্যবস্থা আধুনিক হওয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দুর্ভিক্ষের সম্ভবনা হ্রাস পেয়েছে।

ভূমিকম্প:

ব্রহ্মপুত্র উপতক্যায় অর্থাৎ আসাম অঞ্চলে ভূমিকম্পের হার অপেক্ষাকৃত বেশী। গাইবান্ধা জেলা ভুমিকম্প অঞ্চলের সন্নিকটস্থ হওয়ায় এই জেলাতে মাঝে মাঝে ভূমিকম্পন হয়। পূর্বের ভূমিকম্প গুলির কোন রেকর্ড না থাকলেও ১৮৮৫ সালের ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে সরকারি নথিতে। তবে ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে এবং এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য। ভূমিকম্পের ফলে ভূ-পৃষ্টের দ্রুত পরিবর্তন সাধিত হয়।

১৮৯৭ সালের ১২ ই জুন বিকেল ৫.১৫ মিনিটে স্থায়ী ভুমিকম্প বাংলা, বিহার ও আসামে ব্যাপক ক্ষতি করে। এর ফলে শষ্যাদি কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি, পাতকুয়া, রাস্তাঘাট, সড়কসেতু, রেলপথ বিধ্বস্ত হয় আবাদী জমি বালুচরে রুপান্তরিত হয়। এই ভূমিকম্পের ফলে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ছোট ছোট শাখা নদী খালের তলদেশ উত্থিত হওয়ায় এন্ডলির গতি হ্রাস পায়। এর ফলে ছোট ছোট শাখা নদী খালের তলদেশ উত্থিত হওয়ায় এগুলির গতি হ্রাস পায় বা অনেক ক্ষেত্রে গতি পথ পরিবর্তন হয়েছিল। সারাই ও মানস নদীসুন্দরগঞ্জ ও গাইবান্ধা উপজেলায়, আখিরা ও নলেয়া খাল পলাশবাড়ি উপজেলায় এবং জেলার ঘাঘট নদীর গতি প্রবাহ হ্রাস পায় এবং এই উজেলার পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক বিল উচু হয়ে আবাদী জমিতে পরিণত হয়,আবার অনেক উচু ও আগাছাপূর্ণ জমি বিল কুড়ায় (গভীর খাদ) পরিণত হয়েছে। উল্লেখিত সময়ে পীরগঞ্জের বড়বিলা থেকে সৃষ্ট নলেয়া খাল গতিপ্রাপ্ত হয়েছিল। এই ভুমিকম্পের প্রভাবে সাবেক রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহুকূমায়, অপেক্ষাকৃত বেশী পরিবর্তন হয়েছিল। ১৮৯৭ সালের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে এতদঅঞ্চলে একটি ছাড়া প্রচলিত রয়েছে।

 

তেরশ চার সালের

একত্রিশে জ্যৈষ্ঠ্য শনিবার

দুনিয়া মাঝে হইল মাঝার।

(সংগ্রহ: হাজী আফাজ উদ্দিন হক্কানী ব্রীজ রোড)

১৯২০ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ৬৮ বছরে এই অঞ্চলে ৪৬৪ বার ভূ-কম্পন হয়েছে, রিখটার ঙ্কেলে এসবের তীব্রতা ছিল ৫ থেকে ৮ । এসব মৃদু ভূমিকম্প উল্লেখযোগ্য নয় তাই এই ক্ষুদ্র পরিসরে এসব ভূ- কম্পেনের বিবরণ উপস্থাপন করা হলো না।

 

উদ্ভিদ সম্পদ:

অতীতে সাবেক রংপুর জেলার দক্ষিণাংশে অর্থা গোবিন্দগঞ্জের বিরাট, ঘোড়াঘাট, কাটাবাড়ি অঞ্চলে সামান্য বনভূমি ছিল তেলোর অন্যান্য অংশে ও প্রচুর বনজবৃক্ষ জন্মাত। কিন্তু বর্তমানে গাইবান্ধা জেলায় কোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল নেই। তথাপি জেলার সর্বত্র আম, কাঠাল, জাম, লিচু, বেল, কদবেল, আমড়া, বরই, তেঁতুল ইত্যাদি ফলবান বৃক্ষ রয়েছে। ১৮০৯ সালে ডা: বুকানন হ্যামিলটন ভবানীগঞ্জ থানায় প্রচুর, হিজল গাছ দেখেছিলেন। বর্তমানে শিশু, শাল, মেহগনী, পিতরাজ, গজারি, জারুল, হিজল, নিম, ঘোড়ানিম, রেইনট্রি, করাই, শিমুল-বট, পাইকুড়, সোনাল, ডুমুর, কদম, শিমুল, গাব ইত্যাদি কাঠের গাছ তেজপাতা, অমেলকি, হরিতকি, ঔষধি গাছ দেখা যায়। যদিও এন্ডলির পরিমাণ অত্যন্ত কম।  জ্বালানী হিসেবে, বাড়িঘর, তৈরীতে, আসবাবপত্র তৈরীতে কাঠ অপরিহার্য উপাদান। এখানে ইটের ভাটাতে এখনো কাট ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়া সুপারী বাগান বাঁশ বাগন, বেতবাগান, নারিকেল, তাল ও খেজুর গাছ সব গ্রামেই আছে। জেলার অনেক স্থানে লতা গুল্মজাতীয় ঝোপঝাড় পরিদৃষ্ট হয়। ডালিম, লেবু, বাতাবি লেবু, করমচা, নটকোল, পেয়ারা বৃক্ষসহ অনেক ফুলের গাছা শহর বা  গ্রামের অনেক বড়িতে আছে।

তথাপি জনসংখ্যার তুলনায় জেলার বনজ সম্পদের পরিমাণ অপ্রতুল। বর্তমানে সামাজিক বনায়নে বনবিভাগ, এল,জি,ই,ডি, কৃষি বিভাগসহ বিভিন্ন  এনজিও এগিয়ে এসেছে। ব্যাক্তিগত উদ্যোগে ও জেলায় অনেক নার্সারী গড়ে উঠেছে।

পশু, পাখি, সরীসৃপ সম্পদঃ

১৮০৮-০৯ সালের বুকানন হ্যামিলটন এর বিবরণীতে জানা যায় এই জেলার অনেকাংশে ঝোপঝাড় ও জঙ্গল ছিল । এসব জঙ্গলে বিভিন্ন প্রকার পশু-পাখি দেখা যেত। আসামের জঙ্গলও গারো পাহাড় থেকে অনেক সময় দলছুট হয়ে খাদ্য অন্বেষায় হাতি চিতাবাঘ, বন্যমহিষ ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলেও জেলার অন্যান্য জঙ্গলে চলে আসত।  বর্তমানে গাইবান্ধা জেলায় বনাঞ্চল বা বড় আকারের জঙ্গত নেই। ছোট ছোট জঙ্গল ঝোঁপ  খরগোশ ইত্যাদি নগন্য সংখ্যায় দেখা যায়। গৃহপালিত জন্তু হিসেবে গাই-বলদ, মহিষ, ছাগল, ভেড়া পরিচিত। কুকুর এবং বিড়াল অনেকে প্রতিপালন

করেন। আবার রাস্তাঘাটেও বেওয়ারিশ কুকুর বিড়াল দেখা যায়। সামান্য সংখ্যক লোক ঘোড়া, কিংবা শুকুর পালন করে।

জেলার বিভিন্ন ঝোপঝাড় বাগানে বিভিন্ন প্রকার সাপ দেখা যায়। পানিতে ঢেঁড়া ও মেনী সাপ দেখা যায়। ঝোপঝাড়ে বেজী, গুইসাপ কদাচিৎ, তবে ইদুর চিকা-টিকটিকি সর্বত্র দেখা যায়। নদীতে কূমির বা ঘড়িয়াল পাওয়া যায় না। কিন্তু কিছু বছর পুর্বে ব্রক্ষপুত্র নদে কুমিরের বাচ্চা এবং ১৯/২০ বছর পূর্বে রসুলপুরের সম্মুখে ব্রহ্মপুত্র নদে ১ ঘড়িয়াল পেয়ে তা ধরে মমকুমা প্রশাসক এর অফিস চত্বরে আনা হয়েছিল। পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার জন্য বিভিন্ন পশুপাখির প্রজাতি বিলুপ্ত হচ্ছে।

 

মৎস্য সম্পদঃ

গাইবান্ধা জেলার পুকূর বিল নদীতে মিঠাপানির সব রকম মাছেই পাওয়া যেত। ..ঐিঅঘঞঊজ তার অ ঝঞঅঞওঈঅখ অঈঈঙটঘঞ ঙঋ ইঊঘএঅখ গ্রন্থে সাবেক রংপুর জেলায় প্রাপ্ত ১২৬ প্রকারের মাছের নাম উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ৪০ টি প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়েছে এক যুগ পূর্বে। আরো বেশ কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। তবে তেলাপুইয়া, নাইলোটিকা, সিলভারকাপ, মিনারকাপ, গ্লাসকাপ, কার্ফু পুকুরের থাই পাঙ্গাস, আফ্রিকান মাগুর ইত্যাদি নতুন কিছু  আমদাীকৃত প্রাজাতি এখানে চাষাবাদ হচ্ছে এবং আমাদের খাদ্যের চাহিদা মেটাচ্ছে।

 

গাইবান্ধা জেলা মৎস্য সম্পদ অফিস থেকে সংগৃহীত মৎস্য বিষয়ক একটি তথ্যচিত্র এখানে উপস্থাপন করা হয়ঃ

 

জেলায় মোট কৃষি জমির পারিমাণঃ ১,৭৯, ২৪০.২২ হেক্টর। জেলায় মোট জলাশয়ে পরিমাণঃ ৫০৫০.৩০ হেক্টর। জেলায় মোট খাস পুকুরের সংখ্যাঃ ৩৮৪টি আয়তন ৩৮৪ হেক্টর । ব্যাক্তি মালিকানাধীন পুকুরের সংখ্যাঃ ১৪৬৭৪ টি আয়তন ১২৮৮.৫৯ হেক্টব মেটি বিলের সংখ্যা ৮৮টি আয়তনঃ ১২১০ হেক্টর। মাছের প্লাবনভূমি ১৪টি আয়তনঃ ১৭টি।

[এগুলি হচ্ছে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, আলাই, মানস, নলেয়া, মচ্ছনদী, বাঙ্গালী ইত্যাদি]

সর্বক্ষণিক মৎসজীবির সংখা ৭৭৫৩ জন। বাৎসরিক মাছের চাহিদাঃ ২৬,২৭৭.১০ মেট্রিক টন। মাছের মোট উৎপাদনঃ ১৯,৩৮৩,০৩৪ মেট্রিকটন। মাছের মোট ঘাটতিঃ ৬৮৯৪.০৭ মেট্রিক টন।

 

কৃষি সম্পদঃ

জেলার মুল উৎপাদিত সম্পদ হচ্ছে কৃষি সম্পদ। জীবিকা হচ্ছে কৃষিকাজ উত্তরবঙ্গ ছিল পুন্ড্রবর্ধন এর অন্তর্গত আর অনার্য ভাষায় পুন্ড্রজাতি অর্থ হল কৃষক জাতি। এই অঞ্চলের তথা গাইবান্ধা জেলার কৃষি সভত্য অত্যন্ত প্রাচীন সম্ভবত নব্য প্রস্তর যুগের শেষদিকে এই অঞ্চলে কৃষিজাত শুরু হয়েছিল। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমাংশে ২০% এঁটেল মাটির খীয়ার অঞ্চল ব্যাতিত জেলার অবশিষ্ট ৮০% অংশই বেলে, বেলে-দোআশ ও দোঁয়াশ শ্রেণীর মৃত্তিকা যা কৃষিকাজের জন্য উপযোগী। গাইবান্ধার আবহাওয়া মোটামুটি চরমভাবাপন্ন এবং বৃষ্টিপাপাতের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশী।

 

এ সি হার্টলীর রিপোর্ট থেকে জানা যায়, যে সাবেক রংপুর জেলার  দক্ষিণে খীয়ার অঞ্চল পর্যন্ত আমন ধান উৎপাদন বেশি হত। পলাশবাড়ীও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পূর্বাংশ সহ জেলার পুর্বাংশে পাট উৎপাদন বেশি। পাট অন্যতম অর্থকারী ফসল। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বিরাট অংশসহ সমস্ত জেলাতেও আখ চাষ করা হয়। উৎপাদিত আখ মাহিমাগঞ্জে রংপুর চিনিকলের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এলাকায় গমের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। আউশ ধানের চাষ কমে এসেছে কিন্তু এই এলাকায় গম ও বোরো চাষের পরিমাণগত কয়েক বছরে বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া এই অঞ্চলে আদা, হলুদ, ভুট্টু, মরি ইত্যাদির চাষ করা হচ্ছে। গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ী থানায় কলা চাষের পরিমাণ ও অনেক বেড়েছে। তবে অর্থনৈতিক শস্য হিসেবে ইতিপুর্বে যে তামাক চাষ হয়েছে বর্তমানে এই জেলায় তা একেবারেই কমে গেছে।

 

খনিজ সম্পদঃ

এখন পর্যন্ত এ জেলাতে উল্লেখযোগ্য কোন খনিজ সস্পদের সন্ধান পাওয়া যায় নি।

 

জনসম্পদঃ

কোন অঞ্চল বা জনসংখ্যার পরিমাণও ঘনত্ব সেই ভৌগলিক পরিবেশ প্রভান্বিত করে সেরুপ ভাবে তাদের পরিশ্রম ও কর্মদক্ষতা জাতির উন্নয়নে সহায়ক। জেলার জনসংখ্যার বিভিন্ন সময়ের পরিসংখ্যান নিম্নে প্রদত্ত হলো:

১৯০৮-০৯ সালে বুকানন এর বিবরণীতে সাবেক রংপুর জেলার অন্তর্গত থানাগুলির জনসংখ্যার পরিমাণ প্রদত্ত হয়েছিল। নিম্নে সাবেক রংপুর জেলার অন্তর্গত থানাগুলির জনসংখ্রার পরিমাণ প্রদত্ত হয়েছিল। নিম্নে সাবেক ভবানীগঞ্জ থানা এবং বর্তমান গাইবান্ধা জেলার অন্তর্গত ও পাশ্ববর্তী এলাকার থানা গুলির সে সময়ের জনসংখ্যার পরিমাণ উপস্থাপন করা হল।

 

.................

 

১৯৭২ সালে উপমহাদেশে প্রথম আদশগুমারী সম্পন্ন হয়। তখন মহামুকার (বর্তমান গাইবান্ধা জেলার) জনসংক্যা নিম্নরুপ ছিল।

................

১৯৮১ সালের আদমগুমারী অনুযায়ী গাইবান্ধা মহাকুমার জনসংখ্যা ৪৬৩৬০১ জন এবং ১৯০১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী গাইবান্ধা মহাকুমার জনসংখ্যা ৫২০১৮৪ জন।

 

১৯০১ সালে গাইবান্ধা শহরের লোকসংখ্যা ছিল ১০০৫ জন, ১৯৪১ সালে গাইবান্ধা পৌরসভার লোক সংখ্যা ছিল ১৩১২৮ জন, ১৯৫১ সালে এই জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হছছিল ১৪১৩০ জন এবং জনসংখ্যা ছিল ৯৬২৮১ জন। তার মধ্যে পুরুষ ৪,৯৫,৯৩৬ জন এবং মহিলা ৪৬৬৯৩৬ জন। ২০০০ সালে আদমশুমারী হলেও তার রিপোর্ট এখনো পরিসংখ্যা এর তথ্য নিম্নে দেওয়া হল:

 

২। এই রিপোর্ট প্রকাশের পর গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে জেলায় পৌরসভার সংখ্যা ২টি।

 

নিম্নে গাইবান্ধা জেলার ১৯৯১ সালের থানা এবং ধর্মভিত্তিক আর একটি জনসংখ্যার পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হলো:

 

জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারের তুলনায় খাদ্য, স্বাস্থ্য, সেবা, মাথাপিছু জমির পরিমাণ কম হওয়ার ফলে দরিদ্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

গাইবান্ধা জেলায় জলপথ ও স্থলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

গাইবান্ধা জেলার নদী গুলির তীরেই গড়ে উঠেছিল আদিকালের জনবসতি, ব্যবসা কেন্দ্র, প্রশাসনিক কেন্দ্র, ভবানীগঞ্জ, কালগিঞ্জ, সুন্দরগঞ্জ, গোবিন্দগোঞ্জ, ঘোড়াঘাট, তুলশসীঘাট, গাইবান্ধা, বাদিয়াখালী, মহিমাগঞ্জ, সাহেবগঞ্জ ইত্যাদি। যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ছিল ছোট-বড় নৌকা, বজরা।

 

রংপুর এবং গাইবান্ধা উভয় শহরই ঘাঘট নদীর তীরে অবস্থিত। নৌকা ছিল যোগাযোগের মাধ্যম। ১৯০৭-০৮ সালে ঘাঘট বাগুড়িয়া খালের সংযোগ নিয়ে মানস হয়ে বহ্মপুত্র নদের সঙ্গে যুক্ত হলে ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। নদী পথেই গাইবান্ধার পাট নারায়ণগঞ্জ-ঢাকায় রপ্তানী হয়। মহাজনী মাল ঢাকা থেকে এবং নারিকেল নিয়ে বড় বড় নৌকা খুলনা-বরিশাল থেকে গাইবান্ধায় আসে। তিস্তা নদী রংপুর-হারাগাছ সুন্দরগঞ্জ হয়ে ঢাকা খুলনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করত। করতোয়া নদী আদিকালে পুন্ড্রবর্ধন (মহাস্থান) থেকে গোবিন্দগঞ্জ হয়ে ঘোড়াঘাট এর সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করত। ঘোড়াঘাট থেকে পাঠান শাসকরাও করতোয়া দিয়ে ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করত। জেলার অভ্যন্তরে ছোট ছোট নালা খাল দিয়ে বিভিন্ন বন্দর হাট, লোকালয়ে যাতায়াত করা যেত। রেল চালু হওয়ার আগে কলিকাতা ও আসামের সংযোগ গড়ে তুলেছিল। ‘‘রিভারস্কীম নেভিগেশন কোম্পানী ও ইন্ডিয়া জেনারেল স্কীম নেভিগেশন কোম্পানী’’ এর জাহাজ কলিকাতা থেকে আসাম যাতায়াত করত। ব্রহ্মপুত্র নদী তীর কালীগঞ্জে (ভবানীগঞ্জ থানা রংপুর জেলা) স্টীমার স্টেশন ছিল। তৎকালে জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা এই ঘাট কেন্দ্রীক গড়ে উঠেছিল।

 

স্থলপথে যোগাযোগের মাধ্যম রাস্তা। জেলার চতুর্দিকে রাস্তা জালের মতো ছড়ানো বিছানো। পূর্বে পায়ে হেঁটে, গরু গাড়ি এবং ঘোড়া বা ঘোড়াগাড়ী যাতায়াত মাধ্যম ছিল। বর্তমানে রাস্তাগুলির যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে বহন হিসেবে আধুনিক বাস সার্ভিস, ট্রাকের ব্যবহার হচ্ছে। এই রাস্তা গুলির পাশেই গড়ে উঠেছে ব্যবসা কেন্দ্র, নগর সভ্যতা।

গাইবান্ধা জেলার সাবেক রাস্তাগুলি ছিল (১) ঘোড়াঘাট থেকে গোবিন্দগঞ্জ হয়ে ময়মনসিংহ দিয়ে ঢাকা (২))ঘোড়াঘাট থেকে কামদিয়া, রাজা বিরাট পানিতলা হাট কিচক হয়ে মহাস্থান (৩)ঘোড়াঘাট থেকে করতোয়া হয়ে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত একটি রাস্তা বা জাঙ্গাল বা বাধটির ধ্বংসাবশেষ কুপতলা রেল ষ্টেশনে মাইল দক্ষিণে (পশ্চিম-পূর্বে লম্বা) এখনো দেখা যায়। একটি রাস্তা ঘোড়াঘাট থেকে কোমড়পুর হাটের পূর্বে রামপুর পর্যন্ত ছিল। রামপুর বর্দ্ধনকুঠির রাজাদের সাবেক বাড়ি ও কাচারী ছিল যা বরিশাল মৌজার অন্তর্গত। সারিয়াকান্দি, সোনাতলা, জুমারবাড়ি হয়ে একটি মহাসড়ক গাইবান্ধা জেলার বাদিয়াখালী, থানসিংহপুর স্পর্শ করে ভবানীগঞ্জ পর্যন্ত গিয়েছিল। এগুলির অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে আর নেই। বিভিন্ন রিপোর্টে ও আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থে এসবের সামান্য উল্লেখ রয়েছে।

 

সার্ভেয়ার জেনারেল জেম্স রেনেল ১৭৬৪-৭২ পর্যন্ত এতদঞ্চলে জরিপকালে অনেক প্রসিদ্ধ স্থানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ পথ দেখেছিল। সেগুলির মধ্যে রাজা নিলম্বরের রাস্তা হিসাবে পরিচিত ঘোড়াঘাট কুচবিহার রাস্তা ঘোড়াঘাট গোবিন্দগঞ্জ ময়মনসিংহ ঢাকা মহাসড়ক অন্যতম যা বর্তমান গাইবান্ধা জেলার উপর দিয়ে গিয়েছে। এছাড়াও রংপুর শিবগঞ্জ (বগুড়া) রাস্তা ও রংপুর কামদিয়া রাস্তার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন।

 

ঐ জরীপের একশত বছর পরে ১৮৭১-৭২ সালে ডাব্লিউ, ডাব্লিউ হান্টার এর বিবরণী থেকে জানা যায়- সাবেক রংপুর জেলার ২ টি প্রধানতম রাস্তা গাইবান্ধা জেলার উপর দিয়ে গিয়েছে। এগুলির একটি রংপুর পদহারা (বগুড়া) সড়ক ৩০ মাইল এবং রংপুর ভবানীগঞ্জ সড়ক ৪৫ মাইল দীর্ঘ। ভবানীগঞ্জ মহকুমা  সংলগ্ন কালীগঞ্জে স্টীমার স্টেশন থাকায় এবং এখান দিয়েই আসাম-কলিকাতা যাতায়াত পণ্য পরিবহণের সুযোগ থাকায় এই রাস্তাটির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। রাস্তা গুলিতে শালকাঠের সেতু ব্যবহার করা হত। এ. সি. হার্টলীর (১৯৩১-৩৮)ঃ সালের রিপোর্টে জানা যায় পুরাতন রাস্তা গুলির চিহ্ন অনেকক্ষেত্রে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। তথাপি সাবেক রংপুর জেলার রাস্তাগুলির, যেগুলি গাইবান্ধাকে স্পর্শ করেছে। সেগুলি হচ্ছেঃ

১। রংপুর পীগাছা, বামনডাঙ্গা, নলডাঙ্গা, কামারপাড়া, গাইবান্ধা সড়ক। ২। রংপুর, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, পলাশবাড়ি, গোবিন্দগঞ্জ, বগুড়া সড়ক। ৩। গাইবান্ধা, সাদুল্লাপুর, বড়দরগা, বদরগঞ্জ সড়ক। ৪। গাইবান্ধা, পলাশবাড়ি সড়ক। ৫। গোবিন্দগঞ্জ-মহিমাগঞ্জ সড়ক।

 

বর্তমানে বিশ্বরোড নামে খ্যাত জাতীয় মহাসড়কের পয়ত্রিশ মাইল রাস্তা সাদুল্লাপুর থানার ধাপেরহাট থেকে পলাশবাড়ি থানার উপর দিয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানার শেষ সীমানা চাপরীগঞ্জ মাদ্রাসার পরে শেষ হয়েছে। সমগ্র গাইবান্ধা জেলার ১৯৩ কিঃ মিঃ পাকা সড়ক ১৩০ কিঃ মিঃ আধাপাকা এবং ২৩০৪ কিঃ মিঃ কাঁচা রাস্তা আছে। ৩৬৫ টি সেতু ১২৮১ টি কালভার্ট রয়েছে।

 

১৮৭৫ সালে নর্দাণ বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে নামে একটি কোম্পানী উত্তরবঙ্গে প্রথম রেলওয়ে চালু করে। ১৯০০ সালের পূর্বে একটি মিটারগেজ রেলপথ পার্বতীপুর থেকে রংপুর কাউনিয়া ধুবরী পর্যন্ত এবং সন্তাহার থেকে বগুড়া বোনারপাড়া থেকে ফুলছড়ি ঘাট পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। ১৯০৭-০৯ সালে বোনারপাড়া থেকে কাউনিয় পর্যন্ত রেলপথ যুক্ত হয়। গাইবান্ধা জেলার রেলস্টেশনগুলি হচ্ছেঃ বামনডাঙ্গা, নলডাঙ্গা, কামারপাড়া, কুপতলা, গাইবান্ধা, ত্রিমোহিনী, বালাসীঘাট রেলওয়ে ফেরী স্টেশন, বাদিয়াখালী, বোনারপাড়া জংশন, মহিমাগঞ্জ, ভরতখালী, ফুলছড়ি, তিস্তামুখ ঘাট রেলওয়ে স্টেশন। এই জেলায় রেলপথের মোট দূরত্ব প্রায় ৫২ মাইল। সাবেক দিনাজপুর রংপুর জেলা সহ রেলপথের ঢাকার সঙ্গে উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে।